"আল্লাহর নূর: অন্তরের সৌন্দর্য ও জীবন পরিবর্তনের শক্তি"
"আল্লাহর নূর: অন্তরের সৌন্দর্য ও জীবন পরিবর্তনের শক্তি"
[সাহাবায়ে কিরাম যখন রোম, পারস্য ও মিশরের মতো উন্নত সভ্যতার কাছে দীনের দাওয়াত নিয়ে গেলেন, তখন তারা ছিলেন সম্পদে, শিক্ষায় ও জীবনযাত্রায় অত্যন্ত সাধারণ। অথচ সেই সভ্য জাতিগুলো নিজেদের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সব ত্যাগ করে সাহাবাদের অনুসারী হয়ে গেল—যা প্রচলিত নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত।এই অসাধ্য সাধনের রহস্য হলো আল্লাহর নূর—যা আভ্যন্তরীণ, আত্মিক সৌন্দর্য। সভ্য জাতিগুলোর কাছে বাহ্যিক সব ঐশ্বর্য ছিল, কিন্তু অন্তরের সৌন্দর্য ছিল না। সাহাবারা সেই ঐশী নূর নিয়ে এসেছিলেন, যা মানুষকে সোনার মানুষে পরিণত করে।]
اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَن يَّهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُّضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إلهَ إلَّا الله وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَان الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ. الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً.
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلىَّ اللهُ علَيْهِ وَسَلَّمَ، يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوْا لَا إله إلَّا اللهُ، تُفْلِحُوْا. أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ.
দুনিয়ার মানুষ একজন অন্যজন থেকে শিখে-দেখে-অনুকরণ করে-অনুসরণ করে চলে।
মানুষ মানুষই এমনটি করে। কেউ যদি বলে, "আমি নিজেই চলি, কারো কাছ থেকে কিছুই নিই না", তবে তা অর্থহীন। মানুষের মধ্যেই হলো শিখার ক্ষমতা, শিখতে পারে বলে।
এ সৃষ্টিজীবের মধ্যে মানুষকেই আল্লাহ তাআলা শেখার ক্ষমতা দিয়েছেন; বাকি কেউ খুব একটা পারে না। যদিও কোনো কোনো প্রাণী পারে তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। সার্কাসের কিছু জন্তু... যেমন বাঘ, বানর, হাতি কিছু শিখে সার্কাসের খেলা দেখায়, তবে এরা খুবই সীমিত সংখ্যার।
মানুষের শেখার ক্ষমতা অনেক বেশি। শেখার নিয়ম হলো, কোনো কারণে নিজেকে ছোট মনে করে বড় কারো কাছ থেকে শেখা। প্রতিটি বিষয়ে এটি প্রযোজ্য... খেলাধুলা হোক, পোশাক-আশাক হোক। পোশাকের ক্ষেত্রে গরিবরা সাধারণত ধনীদের দেখে দেখে জামা-কাপড় বানায়। এর বিপরীতে, ধনীরা গরিবদেরকে দেখে দেখে তাদের ফ্যাশন বানাচ্ছে—এমনটি হয় না; বরং গরিবরা ধনীকে অনুসরণ করে চলে। তেমনিভাবে গ্রামবাসী শহরবাসীকে দেখে দেখে চলে। এর বিপরীত নয় যে, শহরবাসী গ্রামবাসীর অনুকরণ করে। প্রজারা রাজাদেরকে অনুকরণ করে। এটিই হলো প্রচলিত নিয়ম।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিত সাহাবায়ে কিরাম যখন দাওয়াত নিয়ে আশেপাশের রাজ্যগুলোতে গেলেন, এমনকি রাসূল সা.-এর জীবদ্দশায় মক্কা-মদিনা থেকে দাওয়াত নিয়ে তারা ইয়েমেনে গেলেন, ইরানে গেলেন। রাসূল সা.-এর তিরোধানের অল্প কিছুদিন পর থেকে বড় বড় জামাত দাওয়াত নিয়ে বের হতে আরম্ভ করল রোম, পারস্য, ইস্কান্দরিয়া যা বর্তমানের মিশর অভিমুখে। আর এসব অঞ্চল মক্কা-মদিনার তুলনায় ছিল উন্নত, সভ্য। তাদের সম্পদও অনেক বেশি; তাদের লেখাপড়াও অনেক বেশি; অর্থাৎ, তাদেরকে শিক্ষিত বলা যায়। আর এর তুলনায় দাওয়াত প্রদানকারী সাহাবাগণ ছিলেন অনেক অনুন্নত। এক-দুটি দিক থেকে নয়, অনেক দিক থেকে তারা ছিলেন অনুন্নত।
দুটি বিষয়ে মানুষ সাধারণত অনেক বেশি লক্ষ্য করে। যেমন, কোনো গ্রামে একটি পরিবার অনেক ধনী। অন্যরা সবাই সম্পদের কারণে তাদেরকে অনেক বড় মনে করে, সম্মান করে। আবার আরেকটি পরিবার তেমন একটি ধনী নয়; কিন্তু খুব শিক্ষিত। অর্থাৎ, শিক্ষার কারণে তাদেরকে বড় মনে করা হয়। তো এক পরিবারকে বড় মনে করা হয় সম্পদের কারণে; যদিও তারা শিক্ষিত নয়। আবার আরেক পরিবারকে বড় মনে করা হয় শিক্ষার কারণে; যদিও তারা সম্পদশালী নয়। আর যদি এমন কোনো পরিবার থাকে যে, সম্পদশালী আবার সাথে সাথে শিক্ষিতও, তবে তো সোনায় সোহাগা। তাদের নাগাল অন্যরা কেউ পাবে না। এর মুকাবিলায় যে পরিবার সম্পদের দিক থেকেও গরিব, শিক্ষার দিক থেকেও গরিব... সম্পদের অবস্থা এমন যে, এক বেলা পেটপুরে খেতে পারে না। জামা-কাপড় শতছিন্ন; নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। লেখাপড়ার অবস্থা এমন যে, গোটা পরিবারের মধ্যে একজনও ঠিকানা লিখতে পারে না, চিঠি লিখতে পারে না। তাহলে তো তারা দুই অর্থেই গরিব হবে।
এই গরিব পরিবারের লোক, তারা যদি ধনী পরিবারে যায়—যাদের সবাই শিক্ষিত, বিএ পাস, এমএ পাস—বলে, "আমাদের কাছ থেকে তোমরা জীবনযাপনা শিখ নাও!" তবে ওই ধনী শিক্ষিত পরিবারের লোক তাদেরকে অবজ্ঞার হাসি দিয়ে অন্যদেরকে বলবে, "শুনেছ তাদের কথা, ওদের কাছ থেকে নাকি
আমাদের দীন শিখতে হবে!" এরপর অন্যদেরকে বলবে, "এদেরকে কিছু দান-দক্ষিণা দিয়ে বিদায় করে দাও।" এমনটি বলাই স্বাভাবিক।
এই ধনী ও শিক্ষিত পরিবার আর ওই গ্রামের একেবারে অশিক্ষিত পরিবারের যে ব্যবধান, পার্থক্য ও দূরত্ব, রোমীয় ও সাহাবাদের মাঝে ঠিক ওই ব্যবধান ছিল; বরং আরো অনেক বেশি ব্যবধান ছিল। কারণ, আমাদের দেশের একটি গরিব পরিবার ও ধনী পরিবারের মাঝে এতবেশি পার্থক্য নেই। গরিব যে তারও একটি লুঙ্গি আছে। যদিও সেটি ছেঁড়া। আর জ্ঞানের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, হয়তো ততবেশি টাকা তার নেই; তবে কিছু টাকা পেলে সেও একটি ঘর বানাতে পারবে। রান্না করতে জানে। মাছ কিনতে পারছে না, কারণ সামর্থ্য নেই। যদি মাছ কেনার টাকা পেয়ে যায়, তবে মাছ কিনে কিভাবে মাছ ভাজতে হয়, এটি জানে; এতটুকু জ্ঞান তার রয়েছে। ডিমও ভাজতে জানে। জামা-কাপড় উচ্চ কোয়ালিটির দুর্মূল্য না হলেও জামা-কাপড় কী ডিজাইনের হতে হবে, তা জানে। কিন্তু সাহাবাগণ যারা দীনের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা তো একটি ডিমও ভাজতে জানতেন না। কেমন করে ভাজতে হয়—এ জ্ঞানটুকুও তাদের ছিল না। কেন ছিল না? কারণ, তারা কাউকে ডিম ভাজতে দেখেননি।
আমাদের একজন গরিব লোক, সে ডিম ভাজা খায় না। কিন্তু হয়তো-বা কখনো কোনো সময় ডিমভাজা খেয়েছিল। সে না খেলেও তার বাবা খেয়েছে অথবা তার দাদা খেয়েছে। জীবনে কখনো ডিম দেখেইনি—এমনটি তো নয়। অথচ সাহাবায়ে কিরাম এমনই ছিলেন যে, ডিম তো কখনো খাননি, বরং কখনো দেখেননি; হাঁড়ি-পাতিলও কখনো দেখেননি।
আমাদের গ্রামের লোক আধুনিক বাথরুম কি জিনিস তা দেখেনি; কিন্তু বাথরুম নামে যে একটি জিনিস আছে—এটি তাদের জানা আছে। যদিও তার বাড়িতে না থাকুক। অথচ সাহাবাগণ জীবনে কোনোদিন শোনেননি যে, এসব জিনিসের জন্য আবার ঘরও থাকে। এগুলো তো বাইরে করার কাজ; এগুলো আবার কেউ ঘরে করে নাকি!
তাবলিগের কাজ আরম্ভ হয়েছে মেওয়াতে। মেওয়াত ভারতের একটি এলাকা। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আজ থেকে পঞ্চাশ/ষাট বছর আগে। মেওয়াতিরা যখন প্রথম প্রথম দিল্লিতে আসতো আর তাবলিগের জামাতে যেত আর শহরের ভেতরে যেহেতু প্রাক্ষেতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বাথরুমে যেতে হয়, তো মেওয়াতিরা বাথরুমে গিয়ে কাজ সারতে পারত না যে, ঘরের ভেতরে কিভাবে বাথরুম করবে! বাথরুম তো ময়লা হয়ে যাবে! এগুলো তো বাইরে করতে হয়।
বেচারাদের বড়ই অসুবিধা হতো। কারণ, এগুলো তো ঘরে করার কাজ নয়। তারা ভাবতেই পারতো না যে, এই কাজগুলো ঘরের ভেতর কিভাবে করে! দিল্লিতে রাতের বেলা মসজিদে ঘুমাতে হতো। তো তারা রাতে মসজিদে ঘুমাতে পারতো না। কারণ, ছাদ যদি ভেঙে পড়ে! তারা তো কখনো ছাদের নিচে ঘুমায়নি।
সাহাবাগণ রোমীয়দের মোকাবেলায় এই মেওয়াতিদের থেকে আরো অনেক বেশি দূরে ছিলেন। রোমীয়রা ছিল বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত আর সাহাবাগণ না পড়তে জানতেন; আর না লিখতে জানতেন; না জামা-কাপড় বানাতে জানতেন; না ভালো রান্নাবান্না করতে জানতেন। কোনো ধরণের কোনো জ্ঞান তাদের ছিল না। চালচলন বা জীবনযাপনা—কোনো জ্ঞানই ছিল না।
রাসূল সা.-এর মসজিদ, মসজিদে নববী খোলা মাঠের মাঝখানে ছিল। আশেপাশের সবই খোলা জায়গা। একজন সাহাবী কোনো কারণে মসজিদে এলেন।
মসজিদে ইবাদতে থাকাবস্থায় তার পেশাবের প্রয়োজন হলো। উনি ভরা মজলিশের এক পাশে পেশাব করা আরম্ভ করলেন। মসজিদ আয়তনে বিরাট ছিল না, ছোটই বলা চলে। খেজুরের পাতার তৈরি দেয়াল। পাশে প্রশস্ত মাঠ। সুতরাং এই মসজিদ থেকে বের হয়ে একটু খোলা জায়গায় গিয়ে এই কাজগুলো যে করতে হবে—এ জ্ঞানটুকুও তার ছিল না; বরং মসজিদের ভেতরে বসা ছিলেন, তো মসজিদের ভেতরেই পেশাব করা আরম্ভ করে দিল। আমাদের দেশে কোনো গরিব মানুষ এই পরিমাণ অজ্ঞ নয় যে, সে মসজিদের ভেতরেই পেশাব করা আরম্ভ করে দিবে।
এই সাহাবারাই গিয়েছেন রোমীয়দের কাছে, পারস্যদের কাছে... যারা শেষ জামানা হিসেবে নয়; বরং যে কোনো জামানার তুলনায় সম্পদশালী, জ্ঞানী। তাদের পাণ্ডিত্য বর্তমান সময়ের লোকেরাও পর্যন্ত স্বীকার করে। সাহাবাগণ গিয়েছিলেন ইস্কান্দরিয়া, যা বর্তমানে মিশর আলেকজান্দ্রিয়া। এই আলেকজান্দ্রিয়া হচ্ছে আর্কিমিডিসের শহর। আর্কিমিডিসের নাম শুনেছেন না? সেই আর্কিমিডিসের শহর। তো সাহাবাগণ গিয়েছেন আর্কিমিডিসিদের নিকট দীনের দাওয়াত নিয়ে; অথচ তারা নিজেরা লিখতেও জানতেন না, পড়তেও জানতেন না।
অথচ রোমের স্থাপত্যশিল্প, কারুকার্য ইত্যাদি এখনো বর্তমান দুনিয়াতে নকল করা হয়। সাহাবাগণ গিয়েছেন এই রোমীয়দের কাছে দীনের দাওয়াত নিয়ে। প্রথম কথা তো হলো, যারা জামা-কাপড় বানাতে জানে না, ঘর বানাতে জানে না, রান্না করতে জানে না, লিখতে জানে না, পড়তে জানে না। তারা শিক্ষক হিসেবে ওই সমস্ত সভ্য জাতিগুলোর কাছে কেমন করে গেল? প্রথম আশ্চর্যের বিষয় হলো এটি।
দ্বিতীয় আশ্চর্যের বিষয়টি আরো বড়। সেটি হলো, তারা সাহাবায়ে কেরাম থেকে শিক্ষা নিলো, দীক্ষা নিলো আর ঠিক ঠিক তাদের অনুসারী হয়ে গেলো। আচ্ছা, পাগল তো পাগলামি করতে পারে। যেমনটি গ্রামে হয়ে থাকে যে, একজন পাগল অথবা কয়েকজন পাগল... কখনো কখনো পাগলরা দলবেঁধেও চলাফেরা করে থাকে। একবার পাগলের একটি দল রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে এলো। এসে ছাত্র-শিক্ষক-প্রফেসর সবাইকে ডাকলো যে, তোমরা সবাই আমার কাছে আসো। আমি তোমাদেরকে কিছু বিষয়ে শিক্ষা দিবো। তো এটি খুব আশ্চর্যের কথা নয়; কারণ পাগল তো পাগলামি করতেই পারে। তবে আশ্চর্যের কথা হলো, এসব ছাত্র-শিক্ষক-প্রফেসররা যদি সেই পাগলদের কাছে গিয়ে আদবের সাথে বসে। আর কোনো রসিকতাও নয়; বরং একেবারে সিরিয়াস হয়ে তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তাদের কথা খুব ধ্যানের সাথে শ্রবণ করে। তারা যেভাবে বলছে, সেভাবে নিজেদের পরিবর্তন করে। তাদের জীবনযাপনা, চালচলন, পোশাক-আশাক ওই পাগলদের কাছ থেকে শিখতে আরম্ভ করে। এটিই হলো বড় আশ্চর্যের কথা। পাগলদের দাওয়াত দেওয়াটা আশ্চর্যের কথা নয়; এটি সে দিতেই পারে।
কিন্তু সুস্থ মানুষ যদি তাদের অনুসারী হয়ে যায়, এটাই হবে আশ্চর্যের কথা। আর ঠিক এই আশ্চর্য ঘটনাই ঘটল যখন সাহাবাগণ ইয়েমেনে গেলেন, রোমে গেলেন, পারস্যে গেলেন, ইস্কান্দরিয়া গেলেন; আর ওখানকার অধিবাসীরা যখন ধীরে ধীরে সাহাবাদের অনুসরণ করতে আরম্ভ করলো। উঠাবসা, চালচলন, পোশাক-আশাক—সবকিছুতে সাহাবাদের অনুসরণ করা শুরু করলো। এমনকি কিছুদিনের মধ্যে তারা নিজেদের মাতৃভাষা হারিয়ে সাহাবাদের ভাষাকে তারা নিজেদের ভাষা বানিয়ে নিলো। তারা তাদের অতীত-ইতিহাসকে ভুলে গেল। আর নিজেদের ইতিহাসকে তারা ছোট মনে করতে লাগলো। এমনভাবে সাহাবাদের সাথী হয়ে গেল যে, নিজেদের সব পুরোনো কথাও ভুলে গেল।
মানুষ যে জিনিসকে খুব বড় মনে করে, সেটাকে সে খুব মনে রাখে। গরিব মানুষ; কিন্তু বাপ ছিল জমিদার বা দাদা ছিল জমিদার... তো সে যত গরিবই হোক, ওর দাদা যদি জমিদার থাকে তবে সে যেখানেই সুযোগ পাবে, ওর দাদার গল্প টেনে আনবে। সুযোগ পেলেও আনবে আর যদি সুযোগ নাও পায়, তবুও টেনেটুনে সুযোগ তৈরি করে নিবে। কেমব্রিজে কি কি প্রশ্ন আসতে পারে? ইন্টারভিউতে প্রশ্ন কি কি? আরএইচ এর আলোচনা। তো এই বিষয়ে কিভাবে দাদাকে টেনে আনা যায়! দাদা তো জমিদার ছিলেন; কিন্তু কেমব্রিজে কিভাবে ঢোকাবে! যখন পারছিল না যে, কিভাবে ঢোকাবে, তখন বলতে আরম্ভ করলো যে, "আমার দাদার সময় যিনি কেমব্রিজ মাস্টার ছিলেন উনি আমাকে বলতেন। তবে দাদা যেহেতু জমিদার ছিলেন, তাই তিনি বেশি পাঠা দিতেন না।" অর্থাৎ, কোনো না কোনোভাবে দাদাকে টেনে আনবেই আনবে।
এই রোমীয়রা ছিল সম্ভ্রান্ত জাতি। সমস্ত সভ্যতা ছিল তাদের মুঠোর মধ্যে। এরা সবাই নিজেদের সব অতীতকথা ভুলে গিয়ে, নিজেদের পরিচয় ভুলে গিয়ে এমন হয়ে গেল যে, তাদের বাপ-দাদারা যে সম্ভ্রান্ত ছিল, রোমীয় ছিল, তারা যে জুলিয়াস সিজারের বংশধর—এ কথা বলতেই চায় না। এটি বড় আশ্চর্যের কথা। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে কত লোকের নাম পাওয়া যাবে জুলিয়াস, সিজার। অথচ এদের সাথে রোমীয়দের কোনো সম্পর্কই নেই।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ., যাকে খাজা আজমিরী বলা হয়। আজমির শরীফে উনারা যখন এলেন ফকিরবেশে। উনাদের নামই হচ্ছে ফকির। আর ফকির শুধু নামে নয়, কাজেও ফকির। জামা-কাপড়-ঘর-বাড়ি... সম্পূর্ণ ফকিরের বেশে। এমন নয় যে, উনারা রাজমহলে থাকেন আর উপাধি ফকির; বরং ফকির বাড়িতেই থাকেন, জামা-কাপড়েও ফকির। এসেছিলেন আজমিরে আর তখন দিল্লির সম্রাট পৃথ্বীরাজ। পৃথ্বীরাজ অর্থাৎ, পৃথিবীর রাজা। এই উপাধি যে একেবারে মিথ্যা—এমনটিও নয়। কারণ, তৎকালীন ভারতবর্ষে যে রাজা, সে মোটামুটি পৃথিবীর রাজা হিসেবে দাবিদার। কারণ, তার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। ওরা এ দেশের রাজা ছিল, অর্থাৎ হিন্দুরা। কারণ, তাদের সম্পর্ক রাজাদের সাথে সম্পদের দিক থেকে। তারা তাদের রাজ্য শাসন করে, তাদের হাতে সব ঐশ্বর্য, তাদের হাতেই সব ক্ষমতা। এই হিন্দুরা দলে দলে মুসলমান হতে লাগলো। একজন দুজন করে নয়, এক হাজার দুই হাজার করে নয়, এক লাখ দু লাখ করে নয়, বরং এক ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার জীবদ্দশায় নব্বই লাখ হিন্দু মুসলমান হয়েছে। (সুবহানাল্লাহ) এরা সবাই কোথায় মুসলমান হলো? ফকিররা রাজার ধর্মে যাচ্ছে না; বরং রাজার ধর্মের লোক ফকিরের ধর্মে যাচ্ছে। বিপরীত প্রবাহ। যদি এমন হতো যে, মঈনুদ্দিন চিশতী রহ. হলেন দিল্লির সম্রাট, আর হিন্দুরা হচ্ছে ফকির আর তারা সবাই মুসলমান হলো, তাহলে তো এটি যৌক্তিক হতো; কিন্তু হলো তো তার সম্পূর্ণ বিপরীত। হিন্দু সাম্রাজ্য আর মঈনুদ্দিন চিশতী রহ. হলেন ফকির। আর হিন্দুরা সবাই এই ফকিরের পেছনে পেছনে কেন চলতে লাগলো!
বলছিলাম, সাহাবায়ে কেরামদের সময় যা ঘটলো, ইতিহাসে সেটাই একমাত্র নয়; বরং এর ধারেকাছের জিনিস আবারও হয়েছে। এটি কেমন করে হলো? দুর্ভেদ্য জিনিস! ওই যে প্রথমে বললাম, মানুষ তো সবকিছু অনুকরণ করেই চলে; কিন্তু তাই বলে সব শহরবাসী গ্রামবাসীকে অনুসরণ করবে, তা কিন্তু নয়; বরং গ্রামবাসী শহরবাসীকে অনুকরণ করে চলে। আর সাহাবায়ে কেরামদের মাঝে হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। মূলত আল্লাহ তাআলা মানুষের মাঝে সৌন্দর্যের চারা খুব প্রবল করেছেন। মানুষ সৌন্দর্যের বড় আকাঙ্ক্ষী, বড়ই কাঙাল। সাহাবাগণ এমন এক সৌন্দর্য নিয়ে গিয়েছিলেন, যা ওই সম্ভ্রান্ত জাতির কাছে ছিল না। এর দৃষ্টান্ত যদি একটি গল্প দিয়ে বোঝানো হয় তাহলে ভালো করে বোঝা যাবে।
এক দেশে এক রাজা, বড় রাজা। রাজা যেমন থাকে—তার রাজপ্রাসাদ, রাজমহল। সেখানে ছিল রাজকুমারী। রাজকুমারী বড় হয়েছে অতএব, তার বিয়ে দেওয়া হবে। ঘোষণা করা হলো, যারা রাজকুমারীর পাণিপ্রার্থী তারা যেন রাজকুমারীকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করে। রাজকুমারীকে বিয়ে করতে সাধারণ মানুষ তো সাহস করবে না। আশেপাশের অন্যান্য রাজা যারা ছিল, তারা আগ্রহী হলো। রাজকুমারী ছিল বড় রাজ্যের, তো আশেপাশের ছোট রাজ্যের রাজকুমাররা বেশি আগ্রহী যেন বড় রাজ্যের জামাই হতে পারে। তো খুবই আগ্রহ নিয়ে অনেকেই এলো। বিয়ে করতে হলে বউকে তো একবার দেখতে হবে; কিন্তু দুর্ভাগ্য, রাজকুমারীর যেমন বড় রাজমহল, যেমন বড় তার রাজঐশ্বর্য, ঠিক ততটাই সে কুৎসিত। বরং এর চেয়েও বেশি কুৎসিত। যারাই বিয়ে করার জন্য আগ্রহী হয়ে আসে, তারা রাজমহল দেখে, তার ক্ষমতা দেখে, তার সম্পদ-ঐশ্বর্য সবকিছু দেখে; কিন্তু যখনই তারা রাজকুমারীকে দেখে তো আগ্রহ হারিয়ে ফিরে চলে যায়। বলে, আর কোনো আগ্রহ নেই। ক্রমেই সবাই আগ্রহহীন হয়ে ফিরে চলে গেল। জানাজানি হয়ে গেল যে, রাজকুমারীকে কেউই বিয়ে করতে চাচ্ছে না। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ যারা, তারা বলাবলি করলো যে, কেউ যখন বিয়ে করতে চায় না, তো ঠেকায় পড়ে রাজকুমারীকে আমাদের নিকটই বিয়ে দিবে। সাধারণ মানুষও আগ্রসর হলো। কিন্তু রাজকুমারীকে দেখার পর ওই সাধারণ মানুষও আর রাজি নয়। দেশে ছিল এক অত্যন্ত ফকির।
লোকেরা গিয়ে বললো, তুমি অন্ধ মানুষ। বউ কুৎসিত হলেও বা কী, আর আর সুন্দরীও হলো না যে—দেখতে তো আর পারবে না। আর রাজার জামাই হতে পারলে ধুমধামে জীবন কাটবে। অন্ধ বললো, কথা তো ঠিক। আমি অন্ধ মানুষ, কুৎসিত হলেও দেখতে তো আর পারব না আর রাজার জামাইও হয়ে গেলাম—ভালোই তো হবে। শেষ পর্যন্ত ওই অন্ধ ফকিরের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে যে হয়ে গেল; কিন্তু রাজকুমারীর মনে কি আনন্দ থাকবে? তার মনে বড় ব্যথা, অন্ধ ফকির ছাড়া কেউই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলো না।
রাজকুমারী একবার বের হলো কোনো এক আনন্দ ভ্রমণে। পথিমধ্যে দেখলো, রাস্তার পাশে গাছের নিচে ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছে এক দুষ্ট মেয়ে। দুষ্টের মেয়ের যেমন হওয়ার কথা—জামা-কাপড় ময়লা, জীবনে কখনো চুল বাঁধে নি দিয়েছে চিরুনি আর না দিয়েছে তেল। পোশাক-আশাকও সেরকম; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে রূপ দিয়েছেন ঢেলে। এক নজর যদি পড়ে তবে মানুষ অবাক হয়ে যায়, এত সুন্দর মানুষ হতে পারে! রাজকুমারী সেই দুষ্ট মেয়েকে দেখলো। দেখে তো সে অবাক। কাছে গিয়ে বললো, "আমাকে তুমি তোমার মতো বানিয়ে দাও। আমি তোমার মতো হতে চাই।" গরিব মেয়েটি বললো, "আমার মতো হতে পারবে, এটি সম্ভব। আমি এমন মন্ত্র জানি যে, তুমি আমার মতো সুন্দরী হয়ে যাবে।
তবে শর্ত আছে।" শর্ত কী? শর্ত হলো, "তোমাকে ফুটপাতে ঘুমাতে হবে। ময়লা জামাকাপড় পড়তে হবে। কখনো কখনো উপবাসও করতে হবে।" অর্থাৎ, তোমাকে এ রকম নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে। রাজমহল ছাড়তে হবে। তাহলেই তুমি এ রূপ পাবে। রাজকুমারী তাতে রাজি হয়ে গেল। কারণ, রাজমহলের জীবন সে পেয়েছে। সে জানে, রাজমহলের এ জীবন কত ফাঁকা—যে, দেশের একজন মানুষও তাকে বিয়ে করতে রাজি হলো না। শেষমেশ রাজি হলো শুধুমাত্র এক অন্ধ ফকির। অতএব, ওই জীবন তার জানা আছে।
রাজমহল ছাড়তে তার কোনো আপত্তি নেই। ওর রূপ চাই। তো, দুনিয়ার বড় বড় সভ্যতাগুলোর অবস্থা ছিল ওই রাজকুমারীর মতো। সব ঐশ্বর্য ছিল তার নিজের ভেতরে কিন্তু কোনো রূপ নেই। আর আল্লাহ তাআলা সাহাবাদেরকে পাঠিয়েছেন, অলি-আল্লাহদেরকে পাঠিয়েছেন মানুষের আভ্যন্তরীণ রূপ দিয়ে, সৌন্দর্য দিয়ে।
সৌন্দর্য কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। এক হলো ওই সৌন্দর্য যা আমরা খুব সহজে উপলব্ধি করতে পারি। যেমন, চোখে দেখার সৌন্দর্য—দেখতে সুন্দর; কিন্তু সৌন্দর্য কেবল এই এক ধরনেরই নয়, এ ছাড়াও আরো অন্যান্য অনেক ধরনের সৌন্দর্য আছে। সুন্দর সুর! এটাও আরেক ধরনের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য চোখে দেখার নয়, এটি কানে শোনার। সবচে বড় ও গভীর সৌন্দর্য হলো, যে সৌন্দর্য মন দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় আর থাকেও মনের ভেতরে। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন ওই মনের সৌন্দর্য দিয়ে। কুরআন শরীফে যার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে "নূর" দিয়ে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ.
"আল্লাহ তাআলা আসমান-জমিনের নূর।"
আল্লাহ তাআলা সেই নূর তার নেক বান্দাদের অন্তরে ঢেলে দেন। আল্লাহর নূর যদি কারো অন্তরে পড়ে, আল্লাহর নূরের সৌন্দর্যের ছটা যদি কারো শরীরে লাগে, তবে সে সোনার মানুষে পরিণত হন।
মুসা আ. আল্লাহ তাআলার নূর দেখতে চেয়েছিলেন, সহ্য না করতে পেরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। দেখতেই পারেননি। অথচ নবী ছিলেন। যে নবীর এক পর খেয়ে একজন লোক মরে গিয়েছিল। তিনি পর মারতে চাননি, তাই খুব হালকাভাবে পর মেরেছিলেন। আর মূসা আ. এর এই হালকা পড়েই বেচারা মরেই গেল। সে নবী পর্যন্ত আল্লাহর নূর সহ্য করতে পারলেন না। আল্লাহর নূর এতই প্রবল... এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেননি যে, সরাসরি আমার নূরের দিকে তাকাও; বরং যেহেতু সহ্য করতে পারবেন না, তাই বললেন, ওই পাহাড়ের দিকে তাকাও। পাহাড়ের দিকে একটু নূর নিক্ষেপ করা হবে। ওখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে নূর আসবে, সে নূর তুমি দেখ। যেহেতু সরাসরি তুমি দেখতে পারবে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই পাহাড়ের দিকে নিক্ষেপকৃত নূর দেখতে গিয়ে মূসা আ. অজ্ঞান হয়ে গেলেন। দেখা আর হলো না। আল্লাহ তাআলার সেই নূর যদি আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে মধ্যে ঢেলে দেন, তবে সে কী রূপ নিয়ে আসবে! কী সৌন্দর্য নিয়ে আসবে! আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে সে সৌন্দর্যের দিকে তাকানোর জন্য। যে সেই নূর থেকে কিছুটা নিজের অন্তরের ভেতরে নিতে পারবে, সে যেখানেই যাবে পুরো দুনিয়া পাগল হয়ে তার কাছে আসবে।
এ নূরের জন্য রোমীয়রা চলে এলো, ইরানীরা চলে এলো, মিশরীরা চলে এলো নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতা—সবকিছু ভুলে। অথচ সাহাবারা.... যাদের জামা-কাপড় নেই, যারা রান্না করতে জানেন না, যারা ঘর বানাতে জানেন না; কিন্তু অন্তরের মাঝে এই ঐশী নূর নিয়ে এনেছেন।
খাজা আজমেরী রহ.-এর কথা বলেছিলাম, উনারা ওই নূর নিয়ে এসেছিলেন।
এজন্য দুনিয়ার লাখো লাখো মানুষ পাগল হয়ে তার নিকট চলে এসেছিল। আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানী করে আমাদেরকে এই দীন দিয়েছেন। দীন মানে এই নূরকে নিজের ভেতর নেওয়া। শয়তান ধোঁকা দিবে, উনি ছিলেন মঈনুদ্দিন চিশতী আর রাসূলের যুগে তারা ছিলেন সাহাবী আর আমি মঈনুদ্দিন চিশতীও না, সাহাবীও না, আমি বাঙালি। অতএব, খামোখা এই দীন শিখে আমার কি লাভ! আমি তো তাদের মতো হতে পারব না—এটা হলো শয়তানের কথা।
আসল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা এই দীন সকলের জন্য দিয়েছেন। এই দীন দুর্লভও নয়, দুষ্প্রাপ্য বা কঠিনও নয়। যে নিজের মধ্যে ঈমান-আমল আনবে সে এই নূর অর্জন করবে। বেশি ঈমান হলে বেশি নূর পাবে। তবে একেবারে কিছুই পাবে না, এমনটিও নয়। যদি কেউ এই নূরের অংশটুকুও পায়, তবে তাও প্রচুর।
আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী করে আমাদেরকে এই দীন দিয়েছেন। আমি আমার নিজের মধ্যে যতটুকু দীন আনব, আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী করে ততটুকু নূর আমার অন্তরে ঢেলে দিবেন।
তখন আমার নিজের জীবন সুন্দর হবে, যেটা মানুষের নিকট সবচেয়ে বড় আনন্দের। বরং এর মাধ্যমে নিজের জীবন তো সুন্দর হবে আবার অন্যরাও উপকৃত হবে। এই নূর এত প্রবল জিনিস যে, মানুষের বড় বড় সমস্যা দূর করে দিবে যদি আল্লাহ তাআলা একটু সৌন্দর্য দান করেন। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করার জন্য বের হলো। ঠিক সে মুহূর্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল।
কোনো নির্জন জায়গায় সূর্য ধীরে ধীরে অস্তমিত হচ্ছে—এ সুন্দর দৃশ্য তার চোখে পড়ল। সে গিয়েছিল আত্মহত্যা করতে... এমতাবস্থায় খুবই সম্ভাবনা যে, যদি সূর্য অস্তমিত হওয়ার এ সুন্দর মুহূর্ত তার চোখে পড়ে তাহলে অন্তত ওইদিন তার আত্মহত্যা করা হবে না। সূর্যের ওই অস্তমিত হওয়ার দৃশ্য তার মনে সাময়িক আনন্দ হলেও দিবে। হয়তো তার মনের পরিবর্তন হয়ে যাবে, আর সে ওইদিন আত্মহত্যা করবে না। আর সম্ভাবনা রয়েছে যে, ওইদিন যদি সে আত্মহত্যা না করে তবে হয়তো আর কোনোদিনই করবে না। কেন? কারণ, সূর্য অস্তমিত হওয়ার যে আনন্দ, তা তার চোখে ধরা দিয়েছে। অন্য কোনো কথা তাকে বাঁচাতে পারতো না। হাজারো লাখো টাকা দিয়ে বা বড় বড় ডিগ্রি দিয়ে তাকে আত্মহত্যা থেকে ফেরাতে পারতো না।
কারণ, যে আত্মহত্যা করতে রওনা হয়েছে, সম্ভবত এই সম্পদ তার আগে থেকেই ছিল; কিন্তু এগুলো তাকে আনন্দ দিতে পারেনি। তার অভাব ছিল সৌন্দর্যের। সে সূর্যের অস্ত যাওয়া সৌন্দর্য একটুখানি দেখলো আর ওটাই তার অন্তর পরিবর্তন করে দিলো। এমনটি খুবই সম্ভব।
শুধু আত্মহত্যাই নয়... একজন গিয়েছে হত্যা করতে, মার্ডার করতে। আর সূর্য অস্তমিত হওয়ার সৌন্দর্য তার চোখে পড়লো। তো তার মনের পরিবর্তন হয়ে যাবে। যাকে হত্যা করার জন্য রওনা হয়েছিল, তাকে হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দিবে। কারণ, সূর্য অস্ত যাওয়ার সুন্দর দৃশ্য তার চোখে ভাসছে। মনের পরিবর্তন হয়ে যাবে। পাগল মানুষ সুস্থ হয়ে যায়। অনেক পাগল, পাগল হয়েছে—ই সৌন্দর্যের অভাবের কারণে। যদি সে জীবনে প্রচুর সৌন্দর্য পেত তবে পাগলই হতো না। আর হয়ে গিয়েছে যখন, অতএব যদি তাকে আবার সৌন্দর্যের জগতে আনা হয় তবে সুস্থ হয়েও যেতে পারে।
অথচ দুনিয়ার অন্য কোনো চিকিৎসা তার রোগ দূর করতে পারবে না। এজন্য সৌন্দর্য বড়ই শক্তিশালী। আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানী করে আমাদের দীন দিয়েছেন, আমি যেন নিজেকে সুন্দর করে তুলি। পুরো দুনিয়ার সামনে সৌন্দর্য তুলে ধরি। এটাই আমার দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
"তোমরা সেরা উম্মত; তোমাদেরকে মানব জাতির জন্য বের করা হয়েছে।"
মানবজাতিকে সে ব্যক্তিই দিতে পারবে যার নিকট কিছু আছে। আর যার হাতই খালি, সে আর দিবে কী? আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানী করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আল্লাহর পথে বের হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে কিছু সৌন্দর্য আমি নিজে কিছু নিই আর পুরো দুনিয়াবাসীকে বিলাই।
ঠিক আছে না? ইনশাআল্লাহ! সবাই নিয়ত করি, আল্লাহর পথে আমরা বের হব; ঈমান-আমল নিজের মধ্যে আনব, যেন আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী করে তার নূর আমার জীবনে কিছু ঢেলে দেন। আর এই নূর নিয়ে আমি পুরো দুনিয়ার মানুষের নিকট যাব, ইনশাআল্লাহ।
এজন্য যারা পরীক্ষার্থী, এডমিশন পরীক্ষার জন্য যারা এসেছি, পরীক্ষার পরে সময় লাগানোর নিয়ত করি। এখন তো পরীক্ষা চলছে, ঠিক আছে। পরীক্ষা হয়ে যাক... তবে নিয়ত এখন করব; কিন্তু বের হব পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর। পরীক্ষা হয়ে গেলে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। ওই সময়গুলো আল্লাহর পথে লাগাব। এতএব, এখন থেকেই নিয়ত করি আর নিয়তের নাম লেখাই।
অনেকে ইতস্তত করছ, নিয়ত করো, হিম্মত করো। এখন কঠিন মনে হচ্ছে তবে আল্লাহ সহজ করে দিবেন, ইনশাআল্লাহ। অনেকে হয়তো এরকম ভাবছ যে, কী জানি, শেষ পর্যন্ত পারি-কী না পারি। কারণ, এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত, পরিবারের অনুমতি ইত্যাদি বিষয়ও আছে। অভিভাবকও আছে। আসলে পারি কি না পারি—এটি আমার হাতে নয়। অতএব, পারি কি না পারি—এটি ব্যাপার নয়; বরং এখন দাঁড়ানোর অর্থ হচ্ছে, আমি আমার পক্ষ থেকে যথাসম্ভব চেষ্টা করব। চেষ্টা করব, দুআ করব। তারপর যদি আল্লাহ তাআলা মঞ্জুর করেন, কবুল করেন তবে আমার যাওয়া হবে। আর যদি কিসমতে না থাকে তবে আমার যাওয়া হবে না। কিন্তু আমি যে চেষ্টা করলাম, এটি ব্যর্থ যাবে না। আল্লাহ তাআলা এ চেষ্টাকেও কদর করবেন। এর ফায়দা দিবেন। এজন্য যারা এই আশঙ্কার মধ্যে আছি যে, আমি পারব কি পারব না—এ চিন্তা বাদ দিয়ে এই সংকল্প করি যে, আমি নিয়ত করলাম, চেষ্টা করব, দুআ করব—এ কথার উপর দাঁড়িয়ে যাই। শেষ পর্যন্ত পারা-না পারা এটা আমার হাতে নয়; তবে চেষ্টা করা আমার হাতে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমরা নিয়ত করি, ইনশাআল্লাহ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা আল্লাহর রাস্তায় বের হব। ঈমান-আমল আমরা নিজেদের জীবনে আনব। ইনশাআল্লাহ, পুরো দুনিয়াকে ঈমান আমলের পথ দেখাব। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন।
আমরা কেউ নামাজ কাজা করব না। যে যেখানে যে অবস্থায় থাকি না কেন—ইনশাআল্লাহ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করব।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
দুনিয়ার মানুষ কাজে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে কাজ থেকে সরিয...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৩৬১
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আলেমদের মজমা তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর | بِسْمِ اللهِ الرَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১৯৯০
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৫৭৯
মন চাহি জিন্দেগী, রব চাহি জিন্দেগী
হিন্দুস্তানের মেওয়াতীরা তাদের গ্রাম্য সাদাসিধা ভাষায় একটা কথা বলতেন, এখনো বলেন অনেকে: জীবন দুই ধরন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৪৫৬
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন